রাজ্য, সম্মান ও ক্ষমতা সবই আল্লাহর



বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপদস্থ কর, তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। -[সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৬]
এই আয়াতে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলাই সমস্ত পৃথিবীর অধিপতি। আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছা সম্রাজ্য প্রদান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা রাজ্য কেড়ে নেন। আল্লাহ যা চাননা তা হতে পারে না। আর এটা বিশ্বাস করা প্রতিটা মুমিনের জন্য অপরিহার্য।

এই আয়াতে ঐ নিয়ামতের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ রয়েছে যা রাসূল (সা) এর উম্মাতকে দান করা হয়েছে। তা এই যে, বানী ইসরাঈল হতে নবুওয়াত ছিনিয়ে নিয়ে মাক্কার নিরক্ষর, কুরাইশী আরাবী নাবী মুহাম্মাদ (সা) কে প্রদান করা হয়েছে। আর তাঁকে নবীগণের সমাপ্তকারী এবং সমগ্র জাহানের রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। 

পরবর্তী আয়াতেও আল্লাহর অসীম ও একচ্ছিত্র ক্ষমতার কথা প্রকাশ পেয়েছে। যা কোন রাজা-বাদশা কিংবা মিথ্যা ক্ষমতার দাবিদার কারো পক্ষে কখনো সম্ভব না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
(বলুন) তুমি রাতকে দিনের ভেতরে প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দাও। আর তুমিই জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করে আনো এবং মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের করো। আর তুমিই যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করো। -[সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৭]
অর্থাৎ দিন-রাতের আবর্তন, জীবিতকে মৃত্যু দিয়ে তাকে পুনরায় জীবিত করা এবং রিজিকের ফায়সালা করা সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়।  


তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর    

অহংকারের শেষসীমা


 
যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে এবং পয়গম্বরগণকে হত্যা করে অন্যায়ভাবে, আর সেসব লোককে হত্যা করে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয়, তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। -[সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২১]

আল্লাহ্ সুবহানাহুয়া তাআ'লার নিয়ামতগুলো যেমন অফুরন্ত আনন্দের, তাঁর শাস্তিগুলোও অনেক কষ্টের। আর উপরের আয়াতে যে বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দেয়া হয়েছে তাও হবে অনেক কষ্টের।  আর এ শাস্তিটা হবে তাদের জন্য যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করেছে এজন্যই যে তারা এক আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করে, সত্যকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে, মিথ্যাকে বয়কট করে, ভালো কাজের আদেশ দেয়, মন্দ কাজের নিষেধ করে। আর এতেই শয়তান তার সঙ্গীদের নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে এবং নানারকম মন্দ চক্রান্ত করে। এমনকি তাদেরকে হত্যাও করে। আর এগুলো তারা অহংকার বশত করে থাকে। যেমনটি রাসূল (সা) বলেন: 
সত্যকে অস্বীকার করা ও ন্যায়পন্থীদের লাঞ্ছিত করাই হচ্ছে অহংকারের শেষসীমা। -(মুসলিম: ১/৯৩)
আর যারা অহংকার বশত এই মন্দ কাজটি করে তাদের জন্যই আল্লাহ সুবহানাহুয়া তাআ'লা বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিয়েছেন এবং আরো বলেছেন:  
এরাই হলো সে লোক যাদের সমগ্র আমল দুনিয়া ও আখেরাত উভয়লোকেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই। -(সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২২)

তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর  

মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে যেসব বিষয়াদি


 
মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। -[সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৪]

আল্লাহ্ তা'আলা পার্থিব জীবনকে বিভিন্ন প্রকারের উপভোগ্য বস্তু দ্বারা সুশোভিত করেছেন। এসব জিনিসের মধ্যে সর্বপ্রথম নারীদের কথা বর্ণনা করেছেন। কেননা তাদের অনিষ্ট সবচেয়ে বড়। বিশুদ্ধ হাদিসে রয়েছে রাসূল (সা) বলেন:
আমি আমার পরে পুরুষদের উপর নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও ফিতনা ছেড়ে গেলাম না। - (ফাতহুল বারী ৯/৪১)
অন্য এক হাদিসে রয়েছে:
দুনিয়া একটি উপকারের বস্তু এবং এর সর্বোত্তম উপকারী জিনিস হচ্ছে সতী সাধ্বী স্ত্রী।

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, স্ত্রীদেরকে ভালোবাসার মধ্যে মঙ্গলও রয়েছে এবং অমঙ্গলও রয়েছে।        

এছাড়া উপরের আয়াতে বর্ণিত লোভনীয় বস্তুগুলোর সবই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ সবকিছুকেই একদিন বিদায় জানাতে হবে। তাই এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরকালকে ভুলে থাকা হবে চরম বোকামি। কারণ আমাদের শ্রেষ্ঠতম অবস্থানস্থল ও উত্তম বিনিময় প্রাপ্তির জায়গা মহান আল্লাহর নিকটই রয়েছে। যেমনটি তিনি পরবর্তী আয়াতেই বলেন:
বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসবের চাইতেও উত্তম বিষয়ের সন্ধান বলবো? যারা পরহেজগার, আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে রয়েছে বেহেশত, যার তলদেশে প্রস্রবণ প্রবাহিত, তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখেন।
অর্থাৎ আমরা যখন দুনিয়ায় প্রতি মোহগ্রস্ত না হয়ে আল্লাহর দ্বীন মেনে চলবো তখন আমরা এই দুনিয়ার চেয়ে উত্তম পুরস্কার পাবো। আর তা হবে অনেক আকর্ষনীয়, অনেক পরিচ্ছন্ন এবং অনেক কল্যাণকর।


তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর    
      

কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া



হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান করো। তুমিই সব কিছুর দাতা। -[সূরা আল ইমরান, আয়াত: ৮]

সত্যপথ কিংবা হিদায়ত পাওয়া আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ। আর কখনো কখনো এই অনুগ্রহ কারো কাছ থেকে শয়তান ছিনিয়ে নেয়। তখন সে বান্দা হয়ে উঠে দিকভ্রান্ত কিংবা বক্রপথের অনুসারী। সে নিজেকে আবিস্কার করে মিথ্যা ও হটকারিতার মাঝে। ফলে তার জন্য আবার সত্যপথে ফিরে আসা হয়ে যায় অনেক কঠিন। তাই কেউ যদি দ্বীন ইসলামের সত্যতা ও সৌন্দর্যতা বুঝতে পারে তার উচিত হবে ইসলামের সাথে তাকে জড়িয়ে নেয়া এবং এতে অটুট থাকতে আল্লাহর নিকট দোয়া করা।             

ইবনে আবী হাতীম (রহ) এবং ইবনে জারীর (রহ) বর্ণনা করেছেন যে, উম্মে সালমাহ (রা) বলেন, রাসূল (সা) প্রায়ই নিম্নের দুআটি পাঠ করতেন:
হে অন্তরের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।
অতঃপর তিনি উপরের আয়াতটি পাঠ করতেন।  


তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর   

কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়ই নিজের হাতের কামাই



যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের কল্যাণের জন্যই সে সৎপথে চলে। আর যে কেউ পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অকল্যাণের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না, আমি কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না। -[সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত: ১৫]

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে, সত্যের অনুসরণ করপ এবং নবুওয়াতকে স্বীকার করে, এটা তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হয়। আর যে ব্যক্তি সত্যপথ থেকে সরে যায়, সঠিক রাস্তা থেকে ফিরে আসে, এই শাস্তি তাকেই ভোগ করতে হবে। কাউকে অন্য কারো পাপের জন্য পাকড়াও করা হবেনা। তবে যারা অপরকে পথভ্রষ্ট করে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার পাপ বহন করতে হবে। যেমনটি আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
তারা নিজেদের বোঝার সাথে ওদের বোঝাও বহন করবে যাদেরকে না জেনে তারা পথভ্রষ্ট করতো। -(সূরা নাহল, আয়াত: ২৫)

তার মানে এটা নয় যে যাদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়েছে তাদের পাপ হালকা করে তাদের বোঝা এদের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কারণ মহান আল্লাহ্ প্রতিটা জাতির জন্যই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাদের প্রত্যেকেই সত্য দ্বীন প্রচার করেছেন। কিন্তু আদম সন্তানের কিছু সংখ্যক তাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছে আর অধিকাংশই তা গ্রহণ করেনি। ফলে অস্বীকারকারীদের স্থান হবে জাহান্নাম।

কাফিররা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়ে যখন চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের  প্রতিপালক! আমাদের এখান হতে বের করে নিন, আমরা আমাদের পূর্বের কৃতকর্ম ছেড়ে দিয়ে এখন ভালো কাজ করবো। তখন তাদেরকে বলা হবে, আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি  যে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করার ইচ্ছা করতে পারতে? আর আমি কি তোমাদের মাঝে আমার রাসূল পাঠাই নাই, যে তোমাদেরকে সতর্ক করতো? এখন তোমাদেরকে শাস্তি ভোগ করতেই হবে, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।

এক্ষেত্রে একটি বিষয়ে প্রশ্ন থাকে যে- কাফিরদের নাবালক শিশু যারা শৈশবেই মারা যায়, যারা পাগল অবস্থায় রয়েছে, যারা সম্পূর্ণরূপে বধির এবং যাদের যুগে কোন নবী-রাসুলের আগমন ঘটেনি বা দ্বীনের দাওয়াত পায়নি, এসব লোকদের হুকুম কি?

এ ব্যাপারে প্রথম থেকেই মতভেদ চলে আসছে। এসম্পর্কে যে হাদীসগুলো রয়েছে সেগুলি আমরা সামনে বর্ণনা করছি-

প্রথম হাদীস:
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, চার প্রকারের লোক কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথন করবে। প্রথমে বধির লোক যে কিছুই শুনতে পায় না, দ্বিতীয় হলো সম্পূর্ণ নির্বোধ ও পাগল লোক যে কিছুই জানে না, তৃতীয় হলো অত্যন্ত বৃদ্ধ যার জ্ঞান লোপ পেয়েছে, চতুর্থ হলো ঐ ব্যক্তি যে এমন যুগে জীবন যাপন করেছে যে যুগে কোন নবী আগমন করে নাই বা কোন ধর্মীয় শিক্ষাও বিদ্যমান ছিলো না। বধির লোকটি বলবে: ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমার কানে কোন শব্দ পৌঁছে নাই। পাগল বলবে: ইসলাম এসেছিল বটে, কিন্তু আমার অবস্থা তো এই ছিল যে, শিশুরা আমার উপর গোবর নিক্ষেপ করতো। বৃদ্ধ বলবে: ইসলাম এসেছিল কিন্তু আমার জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল, আমি কিছুই বুঝতাম না। আর যে লোকটির কাছে কোন রাসূলও আসে নাই এবং সে তাঁর কোন শিক্ষাও পায় নাই সে বলবে: আমার কাছে কোন রাসূলও আসে নাই এবং আমি কোন হকও পাই নাই। সুতরাং আমি আমল করতাম কিরূপে? তাদের এসব কথা শুনে আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে নির্দেশ দিবেন: আচ্ছা যাও জাহান্নামে লাফিয়ে পড়ো। রাসূল (সা) বলেন: যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তারা আল্লাহর আদেশ মেনে নেয় এবং জাহান্নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য ঠান্ডা ও আরামদায়ক হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, যারা জাহান্নামে লাফিয়ে পড়বে তাদের জন্য তা হয়ে যাবে ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক। আর যারা বিরত থাকবে তাদেরকে হুকুম অমান্য করার কারণে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

দ্বিতীয় হাদীস:
রাসূল (সা) কে মুসলিমদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, তারা তাদের সন্তানদের সাথেই থাকবে। অতঃপর মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তারা তাদের পিতাদের সাথেই থাকবে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! তারা কোন আমল তো করে নাই? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তা'আলা খুব ভালোভাবেই জানেন।          
   
তৃতীয় হাদীস:
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, প্রত্যেক শিশু দ্বীনে ইসলামের উপরই সৃষ্টি হয়ে থাকে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মাজুসী বানিয়ে দেয়। যেমন বকরীর নিখুঁত অঙ্গ বিশিষ্ট বাচ্চার কান কাটা হয়ে থাকে। জনগণ জিজ্ঞেস করলো: হে আল্লাহর রাসূল (সা)! যদি সে শৈশবেই মারা যায়? উত্তরে তিনি বলেন: তাদের আমল সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সঠিক ও পূর্ণ অবগতি ছিল।

আলিমদের কারো কারো মাযহাব এই যে, তাদের ব্যাপারে নীরবতার ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের দলীলও গত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন তারা জান্নাতী। তাদের দলীল হচ্ছে সহীহ বুখারীর ঐ হাদীসটি যা হযরত সামুরা ইবনু জুনদুব (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, মিরাজের রাতে রাসূল (সা) ইবরাহীম (আ) কে গাছের নিছে দেখতে পান এবং তার পাশে  অনেক শিশু ছিল। আর তারা ছিল মুসলিম ও মুশরিকদের সন্তান। কোন কোন আলিম বলেন যে, মুশরিকদের শিশুরা জাহান্নামী। কেননা একটি হাদীসে রয়েছে যে, তারা তাদের পিতাদের সঙ্গে থাকবে।কেউ কেউ বলেন যে কিয়ামতের মাঠে তাদের পরীক্ষা হয়ে যাবে। অনুগতরা জান্নাতে যাবে আর অবাধ্যরা যাবে জাহান্নামে। শায়খ আবুল হাসান ইবনু ইসমাঈল আশআরী (রহ) বর্ণনা করেছেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব এটাই।   


তথ্যসূত্র:
           

সেদিন আমিই আমার সাক্ষী হবো


 
আমি প্রত্যেক মানুষের ভাগ্য তার কাঁধেই ঝুলিয়ে রেখেছি। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে একটি কিতাব বের করে দেখাব, যাকে সে উন্মুক্ত অবস্থায় পাবে। -[সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত: ১৩]

উপরের আয়াতে সময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যার মধ্যে মানুষ আমল করে থাকে। এখানে আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন যে, মানুষ ভালো বা মন্দ যা কিছু আমল করে তা তার সাথেই সংলগ্ন হয়ে যায়। আর ভালো কাজের প্রতিদান ভালো হবে এবং মন্দ কাজের প্রতিদান মন্দ হবে, তা পরিমাণে যতই কম হোক না কেন। যেমনটি আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
যেই ব্যক্তি অনু পরিমাণ সৎ কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যেই ব্যক্তি অনু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সে তাও দেখতে পাবে। -(সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮)
তোমাদের উপর নিযুক্ত রয়েছে সংরক্ষক ফেরেশতাগণ, সম্মানিত লেখকগণ, যারা তোমাদের সমুদয় কার্যকলাপ অবগত আছে। -(সূরা ইনফিতার, আয়াত: ১০-১২)

অর্থাৎ আদম সন্তানের ছোট বড়, গোপনীয়, প্রকাশ্য, ভালো, মন্দ, সকাল, সন্ধ্যা, দিন ও রাত অনবরতই লিখে নেয়া হয়। আর এতসবের সমষ্টিগত কিতাবখানা (আমলনামা) কিয়ামতের দিন তার ডান হাতে দেয়া হবে অথবা বাম হাতে দেয়া হবে। যারা সৎলোক তারা পাবেন ডান হাতে, আর যারা মন্দলোক তারা পাবেন বাম হাতে। আর এই আমলনামা সে নিজেই পাঠ করে নিতে পারবে। আর তখন নিজেই নিজের সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট হবে। যেমনটি আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্য যথেষ্ট। -(সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত: ১৪)

হযরত হাসান বসরী (র) বলেন যে, এই আয়াতে আদম সন্তানকে সম্বোধন করে বলা হয়-
হে আদম সন্তান! তোমার ডানে ও বামে ফেরেশতা বসে রয়েছে এবং সহীফা (ক্ষুদ্র পুস্তিকা) খুলে রেখেছে। ডান দিকের ফেরেশতারা পূণ্য লিখছে এবং বাম দিকের গুলো পাপ লিখছে। এখন তোমার ইচ্ছা, হয় তুমি বেশি পূণ্যের কাজ করো অথবা বেশি পাপের কাজ করো। তোমার মৃত্যুর পর এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে গ্রীবাদেশে লটকিয়ে  দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন খোলা অবস্থায় তোমার সামনে পেশ করা হবে এবং তোমাকে বলা হবে, তোমার আমলনামা তুমি স্বয়ং পাঠ করো এবং তুমি নিজেই তোমার হিসাব ও বিচার করো।


তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর


প্রাসঙ্গিক বিষয়:


যাদের কোন ভয়ভীতি নেই এবং যারা দুঃখিতও হবেনা



নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদী, নাসারা ও সাবেঈন, (তাদের মধ্য থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে এর সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না। -[সূরা বাকারাহ, আয়াত-৬২]

এখানে উল্লেখিত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে যারা তাদের নবীগণের অনুসারী ছিলেন তাদের প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যুগে যুগে যারা আল্লাহর প্রেরিত নবী-রসূলগণের অনুসরণ করেছে তাদের জন্য এ সুসংবাদ যে তারা প্রাপ্ত হবে অন্তহীন শান্তি এবং ভবিষ্যতের কোন আশংকার জন্য তারা ভীত হবেনা, আর অতীতে কোন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য তারা দুঃখিতও হবেনা।

মানুষ খুবই দ্রুততা প্রিয়



মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তো খুবই দ্রুততা প্রিয়। -[সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১১]

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মানুষের একটি বদ অভ্যাসের কথা উলল্লেখ করেছেন। আর তা হচ্ছে মানুষ কখনো কখনো মনভাঙ্গা ও নিরাশ হয়ে গিয়ে ভুল করে নিজের জন্য অমঙ্গলের প্রার্থনা করতে শুরু করে। মাঝে মাঝে নিজের মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততির জন্য বদ'দুআ করতে লাগে। কখনো মৃত্যুর, কখনো ধ্বংসের এবং কখনো অভিশাপের দুআ করে। কিন্তু তার প্রতিপালক আল্লাহ তার নিজের চেয়েও তার উপর বেশি দয়ালু। এদিকে সে দুআ করে আর ওদিকে যদি তিনি কবুল করে নেন তবে সাথে সাথেই সে ধ্বংস হয়ে যায় (কিন্তু তিনি তা করেন না)।

এই যেমন একটু রেগে গেলেই সন্তানের প্রতি বাবা-মা এর বদদুআ, একটু কষ্ট পেলেই স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অকৃতজ্ঞতা, একটু অসুস্থ হতেই অধৈর্য হয়ে পড়া সবই যেন আমাদের বদ অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। যা থেকে ফিরে আসা খুবই জরুরি। অন্যথায় নিজের ক্ষতি নিজেই যেন তরান্বিত করবো।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমরা নিজেদের জান ও মালের জন্য বদ দুআ করো না। নচেৎ কবুল হওয়ার মূহর্তে হয়তো কোন খারাপ কথা মুখ দিয়ে বেড়িয়ে পড়বে।

আর একমাত্র কারণ হচ্ছে মানুষের চাঞ্চল্যকর অবস্থা ও দ্রুততা। এরই প্রেক্ষিতে হযরত সালমান ফারসী (রা) ও ইবনু আব্বাস (রা) হযরত আদম (আ) এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, তখন তাঁর রুহ তার পায়ের নিম্নদেশ পর্যন্ত পৌঁছে নাই, অথচ তখনই তিনি দাঁড়াবার চেষ্টা করেন।


তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাসীর    

যখন কেউ কারো সামান্য উপকারে আসবে না



আর সে দিনের ভয় কর, যখন কেউ কারো সামান্য উপকারে আসবে না এবং কারও পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নেয়া হবে না এবং তারা কোন রকম সাহায্যও পাবে না। -[সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৪৮]

এখানে যে সময়টির কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে বিচার দিবস। যেদিন সবাই নিজ নিজ আমল অনুযায়ী ফলাফল পেয়ে যাবে। আর সে মূহর্তটা যা কতোটা চিন্তার হবে তা এইমূহর্তে আমরা বুঝতে সক্ষম হবোনা। কারণ সেদিন মা তার আপন সন্তানকে ভুলে যাবে, স্বামী তার স্ত্রীকে ভুলে যাবে। অর্থাৎ সবাই কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যাবে। কেউ কারো জন্য সুপারিশ করারও সাহস করবেনা, কে কারো জন্য উপকার করতেও আসবেনা। কারণ সবাই তখন নিজেকে নিয়েই চিন্তিত থাকবে।

আর যারা ঈমান আনে নাই তাদের জন্য কোন সুপারিশই কাজ করবে না। তাদের প্রিয়জনরাও তাদেরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবেনা। তারা তাদের দুনিয়া সমান সম্পদ দিয়ে বাঁচতে চাইলেও তা কবুল করা হবেনা। অর্থাৎ তারা তখন ফলাফল লাভের চুড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তাই তাদের কোন চেষ্টাই আর কাজে আসবে না। আর এ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহুয়া তাআ'লা কুরআনুল কারীমে অনেক আয়াত নাযিল করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কেউ যদি তার গুরুতর ভার বহন করতে অন্যকে আহবান করে কেউ তা বহন করবে না- যদি সে নিকটবর্তী আত্মীয়ও হয়। -(কুরআন, ৩৫:১৮)
সেদিন তারা প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে। -(কুরআন, ৮০:৩৭)
হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর এবং ভয় কর এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোন কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। -(কুরআন, ৩১:৩৩)

তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর    

আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনার উত্তম উপায়



ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো সালাতের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব। -[সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৪৫]

এ আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহুয়া তাআ'লা আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের কথা উল্লেখ করেছেন। আর তা হল ধৈর্য ও সালাত। কেউ যখন এ দুটিকে তার সঙ্গী করে নিবে তখন শত বিপদের মাঝেও সে নিরাশ হবেনা, হতাশ হবেনা। কারণ তার অন্তর হবে মহান প্রভুর প্রতি পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী। যার ফলে আমাদের সালাফগণকে শত বিপদও সরল পথ হতে এক বিন্দুও টলাতে পারেনি। কারণ তারা জানতো আল্লাহর সাহয্য খুব নিকটেই। আর তারা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে শুধু  আল্লাহর নিকটই চাইতো।

উমার (রা) বলেন, ধৈর্য দু' প্রকার - ১) বিপদের সময় ধৈর্য ও ২) পাপ কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারেে ধৈর্য। দ্বিতীয় ধৈর্য প্রথম ধৈর্য হতে উত্তম।  

সাঈদ ইবনে যুবাইর (রহ) বলেন, প্রত্যেক জিনিস আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে এটা স্বীকার করা, সাওয়াবের প্রার্থনা করা এবং বিপদের প্রতিদানের ভান্ডার আল্লাহর নিকট আছে এ মনে করা ধৈর্য।  

আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ধৈর্যধারণ করাও সাওয়াবের কাজ। আর সাওয়াবের কাজে সালাতের মাধ্যমে বিশেষ সাহায্য পাওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন -
আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। -[ক্বুরআন, ২৯:৪৫]

হুযাইফা (রা) বলেন,
রাসূল (সা) যখনই কোন কঠিন ও চিন্তাযুক্ত  কাজের সম্মুখীন হতেন তখনই সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।   

 
তথ্যসূত্র:
  • তাফসীর ইবনে কাছীর  

"পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। আপনার পালনকর্তা অতি দয়ালু। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।"