কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়ই নিজের হাতের কামাই



যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের কল্যাণের জন্যই সে সৎপথে চলে। আর যে কেউ পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অকল্যাণের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না, আমি কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না। -[সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত: ১৫]

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে, সত্যের অনুসরণ করপ এবং নবুওয়াতকে স্বীকার করে, এটা তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হয়। আর যে ব্যক্তি সত্যপথ থেকে সরে যায়, সঠিক রাস্তা থেকে ফিরে আসে, এই শাস্তি তাকেই ভোগ করতে হবে। কাউকে অন্য কারো পাপের জন্য পাকড়াও করা হবেনা। তবে যারা অপরকে পথভ্রষ্ট করে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার পাপ বহন করতে হবে। যেমনটি আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
তারা নিজেদের বোঝার সাথে ওদের বোঝাও বহন করবে যাদেরকে না জেনে তারা পথভ্রষ্ট করতো। -(সূরা নাহল, আয়াত: ২৫)

তার মানে এটা নয় যে যাদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়েছে তাদের পাপ হালকা করে তাদের বোঝা এদের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। কারণ মহান আল্লাহ্ প্রতিটা জাতির জন্যই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাদের প্রত্যেকেই সত্য দ্বীন প্রচার করেছেন। কিন্তু আদম সন্তানের কিছু সংখ্যক তাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছে আর অধিকাংশই তা গ্রহণ করেনি। ফলে অস্বীকারকারীদের স্থান হবে জাহান্নাম।

কাফিররা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়ে যখন চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের  প্রতিপালক! আমাদের এখান হতে বের করে নিন, আমরা আমাদের পূর্বের কৃতকর্ম ছেড়ে দিয়ে এখন ভালো কাজ করবো। তখন তাদেরকে বলা হবে, আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি  যে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করার ইচ্ছা করতে পারতে? আর আমি কি তোমাদের মাঝে আমার রাসূল পাঠাই নাই, যে তোমাদেরকে সতর্ক করতো? এখন তোমাদেরকে শাস্তি ভোগ করতেই হবে, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।

এক্ষেত্রে একটি বিষয়ে প্রশ্ন থাকে যে- কাফিরদের নাবালক শিশু যারা শৈশবেই মারা যায়, যারা পাগল অবস্থায় রয়েছে, যারা সম্পূর্ণরূপে বধির এবং যাদের যুগে কোন নবী-রাসুলের আগমন ঘটেনি বা দ্বীনের দাওয়াত পায়নি, এসব লোকদের হুকুম কি?

এ ব্যাপারে প্রথম থেকেই মতভেদ চলে আসছে। এসম্পর্কে যে হাদীসগুলো রয়েছে সেগুলি আমরা সামনে বর্ণনা করছি-

প্রথম হাদীস:
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, চার প্রকারের লোক কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথন করবে। প্রথমে বধির লোক যে কিছুই শুনতে পায় না, দ্বিতীয় হলো সম্পূর্ণ নির্বোধ ও পাগল লোক যে কিছুই জানে না, তৃতীয় হলো অত্যন্ত বৃদ্ধ যার জ্ঞান লোপ পেয়েছে, চতুর্থ হলো ঐ ব্যক্তি যে এমন যুগে জীবন যাপন করেছে যে যুগে কোন নবী আগমন করে নাই বা কোন ধর্মীয় শিক্ষাও বিদ্যমান ছিলো না। বধির লোকটি বলবে: ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমার কানে কোন শব্দ পৌঁছে নাই। পাগল বলবে: ইসলাম এসেছিল বটে, কিন্তু আমার অবস্থা তো এই ছিল যে, শিশুরা আমার উপর গোবর নিক্ষেপ করতো। বৃদ্ধ বলবে: ইসলাম এসেছিল কিন্তু আমার জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল, আমি কিছুই বুঝতাম না। আর যে লোকটির কাছে কোন রাসূলও আসে নাই এবং সে তাঁর কোন শিক্ষাও পায় নাই সে বলবে: আমার কাছে কোন রাসূলও আসে নাই এবং আমি কোন হকও পাই নাই। সুতরাং আমি আমল করতাম কিরূপে? তাদের এসব কথা শুনে আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে নির্দেশ দিবেন: আচ্ছা যাও জাহান্নামে লাফিয়ে পড়ো। রাসূল (সা) বলেন: যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তারা আল্লাহর আদেশ মেনে নেয় এবং জাহান্নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য ঠান্ডা ও আরামদায়ক হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, যারা জাহান্নামে লাফিয়ে পড়বে তাদের জন্য তা হয়ে যাবে ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক। আর যারা বিরত থাকবে তাদেরকে হুকুম অমান্য করার কারণে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

দ্বিতীয় হাদীস:
রাসূল (সা) কে মুসলিমদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, তারা তাদের সন্তানদের সাথেই থাকবে। অতঃপর মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তারা তাদের পিতাদের সাথেই থাকবে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! তারা কোন আমল তো করে নাই? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তা'আলা খুব ভালোভাবেই জানেন।          
   
তৃতীয় হাদীস:
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, প্রত্যেক শিশু দ্বীনে ইসলামের উপরই সৃষ্টি হয়ে থাকে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মাজুসী বানিয়ে দেয়। যেমন বকরীর নিখুঁত অঙ্গ বিশিষ্ট বাচ্চার কান কাটা হয়ে থাকে। জনগণ জিজ্ঞেস করলো: হে আল্লাহর রাসূল (সা)! যদি সে শৈশবেই মারা যায়? উত্তরে তিনি বলেন: তাদের আমল সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সঠিক ও পূর্ণ অবগতি ছিল।

আলিমদের কারো কারো মাযহাব এই যে, তাদের ব্যাপারে নীরবতার ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের দলীলও গত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন তারা জান্নাতী। তাদের দলীল হচ্ছে সহীহ বুখারীর ঐ হাদীসটি যা হযরত সামুরা ইবনু জুনদুব (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, মিরাজের রাতে রাসূল (সা) ইবরাহীম (আ) কে গাছের নিছে দেখতে পান এবং তার পাশে  অনেক শিশু ছিল। আর তারা ছিল মুসলিম ও মুশরিকদের সন্তান। কোন কোন আলিম বলেন যে, মুশরিকদের শিশুরা জাহান্নামী। কেননা একটি হাদীসে রয়েছে যে, তারা তাদের পিতাদের সঙ্গে থাকবে।কেউ কেউ বলেন যে কিয়ামতের মাঠে তাদের পরীক্ষা হয়ে যাবে। অনুগতরা জান্নাতে যাবে আর অবাধ্যরা যাবে জাহান্নামে। শায়খ আবুল হাসান ইবনু ইসমাঈল আশআরী (রহ) বর্ণনা করেছেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব এটাই।   


তথ্যসূত্র:
           

২টি মন্তব্য:

  1. আলহামদুলিল্লাহ! অমুসলিম/কাফিরদের শিশুরা কি জান্নাতে যাবে? এই বিষয়ে সুন্দর আলোচনা।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম যে- কাফিররা (হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী, বৌদ্ধরা) কি জান্নাতে যাবে এবং পাগল ও শিশুরা কি জান্নাতে যাবে?

    উত্তর দিনমুছুন

"পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। আপনার পালনকর্তা অতি দয়ালু। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।"