কুরআন বুঝার মূলনীতি

একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি যদি ইসলাম সম্পর্কে একেবারে প্রাথমিক জ্ঞানও অর্জন করতে চান তবুও মনে রাখবেন- এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং প্রতিটি বিষয়েই কিছু মূলনীতি রয়েছে, রয়েছে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা। এগুলো সম্পর্কে অজ্ঞতা রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া মানে নিজের জন্য বিভ্রান্তির দরজা সবসময় খুলে রাখা। আর এ বিষয়টি সামনে রেখেই আমরা এখানে 'কুর'আন বুঝার মূলনীতি' নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো। ইন শা আল্লাহ্ ।


প্রারম্ভিক কথা

ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা যেসব মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোর সর্বপ্রধান উৎস হলো কুর'আনুল কারীম। ঈমান আনয়নকারীদের জন্য এর আয়াতসমূহের মধ্যে রয়েছে অনেক উপদেশ, দিকনির্দেশনা ও তাদের বিশ্বাসের স্বপক্ষে অকাট্ট যুক্তি ও প্রমাণ। এ কারণে একজন ঈমানদারের ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও সফলতা নির্ভর করে কুর'আনুল কারীমের সঠিক অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগের উপর।


গুরুত্ব

সৃষ্টিকুলের উপর যেমন স্রষ্টার সম্মান ও মর্যাদা অপরিসীম , তেমনি সকল বাণীর উপর কুরআনের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অতুলনীয়। মানুষের মুখে থেকে যা উচ্চারিত হয়, তম্মধ্যে কুরআন পাঠ সর্বাধিক উত্তম। ইমাম খাত্তাবী (রহ.) বলেন: হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতের সিঁড়ির সংখ্যা হচ্ছে কুরআনের আয়াতের সংখ্যা পরিমাণ। কুরআনের পাঠককে বলা হবে, তুমি যতটুকু কুরআন পড়েছো ততটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠো। যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআন পড়েছে সে আখেরাতে জান্নাতের সর্বশেষ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাবে। যে ব্যক্তি কুরআনের কিছু অংশ পড়েছে সে ততটুকু উপরে উঠবে। অর্থাৎ যেখানে তার পড়া শেষ হবে সেখানে তার ছওয়াবের শেষ সীমানা হবে।


কুর'আন তাফসীরের শর্ত ও ধারাবাহিকতা



যে দু'টি বিষয় জানা প্রয়োজন

আসবাবুন নুযূল তথা নাযিলের কারণ ও প্রেক্ষাপট জানা। আল-কুর'আন মূলত আল্লাহর কালাম বা বক্তব্য, যার একটি শাব্দিক অর্থ রয়েছে। অনেক সময়ই সে শাব্দিক অর্থ বুঝার জন্য প্রয়োজন সার্বিক প্রেক্ষাপট ও যাদের উদ্দেশ্যে সম্বোধন তাদের বিষয়টি অবগত হওয়া।
আরবী ভাষা জানা। কুর'আন সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। অতএব যে সঠিকভাবে কুর'আন বুঝতে চায় তাকে অবশ্যই আরবী ভাষা বুঝতে হবে। সাথে সাথে কথায়, কাজে ও কুর'আন নাযিলের নানা প্রেক্ষাপটে আরবদের ‘আদাত ও প্রথার সাথে পরিচিত হতে হবে।


যেসকল ত্রুটি থাকতে নেই

  • চিন্তা-গবেষণার ত্রুটির কারণে অনুধাবনে ত্রুটি।
  • যে সব মৌলিক বিষয় একজন মুসলিমের জানা থাকা উচিত, তা জানা না থাকার কারণে কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে ত্রুটি।
  • প্রবৃত্তির অনুবর্তী হওয়ার কারণে সৃষ্ট ত্রুটি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোন ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আকীদায় পূর্ব থেকেই একটি বিষয় স্থির হয়ে আছে, যে কোন ভাবেই সে নিজের ধারণাটি কুর'আনের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। ফলে আয়াত দ্বারা সেভাবে বুঝা না গেলেও সে নিজের আকীদা ও পূর্বাহ্নে স্থিরীকৃত বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আয়াতের বিপরীত অর্থ বুঝে থাকে।


একটু ভাবনা

আমাদের মন যেন একটি সজ্জিত উদ্যান। আর সেই উদ্যানে যদি আমরা কোন গাছ না লাগাই, তাহলে সেখানে জন্মাবে আগাছা। এমনকি যদি আমরা ফুলের গাছ লাগাই, কিন্তু পরিচর্যা না করি তাহলেও সেখানে আগাছা জন্মাতে থাকবে। আমাদেরকে সর্বদাই আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, কেবল তখনই আমরা আমাদের উদ্যানের সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারব।

মনের ফুল হচ্ছে হেদায়াত,আল্লাহর বাণী,আল্লাহর দেখানো পথ, আর আগাছা হচ্ছে শয়তানের ওয়াসওয়াসা, কুচিন্তাসমূহ। প্রতিবার যখন আমরা কুর’আন তিলাওয়াত শুনি সালাতে কিংবা অন্যত্র তখন আমাদের মনে একটি ভালো অনুভূতি জন্ম নেয়, আমরা যদি সেই আয়াতসমূহের প্রতি মনোযোগ না দেই, কি বলা হচ্ছে তা বুঝার চেষ্টা না করি, আল্লাহর আয়াত-নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করি তাহলে তা হবে ফুল গাছ লাগানো বাগানে পানি না দেওয়ার মত, সেখানে জন্মাবে আগাছা আর সেই উদ্যান নষ্ট হয়ে যাবে।


সারকথা

কুরআন শুধু কতগুলো শব্দ, ব্যাকরণিক বিন্যাস, ছন্দ ও অন্তমিলেরই সমষ্টি নয়; বরং তা এর চেয়ে ব্যাপক অর্থবহ একটি গ্রন্থ। এটি এমনই একটি গ্রন্থ যা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক তৈরী করে তাদের অধিকার স্পষ্ট করে। একই সাথে দুনিয়া ও আখিরাতের চেহারা উন্মোচন করে জান্নাত-জাহান্নামের সত্যতা বহন করে। অর্থাৎ যেকোন বিচার-বিবেচনায় তা এমনই এক শাশ্বত মুজিযা যে, এর সমমানের কোনো কিছু কেউ তৈরী করতে সক্ষম হয়নি এবং হবেও না। তাই কুরআনের শাশ্বত বাণীকে সঠিক স্থান হতে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। এক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত উপেক্ষা করে সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা মেনে চলতে হবে।


প্রাসঙ্গিক বিষয়



কুর'আন বুঝার মূলনীতিতে যেসকল গ্রন্থের সাহায্য নেয়া হয়েছে

তাফসীর ইবনে কাসীর -ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)
ই‘লামুল মুয়াক্কিয়ীন -ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)
কুরআন বুঝার মূলনীতি -ড. আবু আমিনাহ্ বিলাল ফিলিপ্স
    "পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। আপনার পালনকর্তা অতি দয়ালু। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।"