বিশ্বাসীদের বিশ্বাস



الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
"যারা অদেখা বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করে, ....." -[সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৩]

হযরত আব্দুল্লাহ (রা:) বলেন যে, সত্য বলে স্বীকার করাকে ঈমান বলে। হযরত ইবনে আব্বাসও (রা:) এটাই বলেন। হযরত যুহরী (র:) বলেন যে, আমালকে ঈমান বলা হয়। হযরত রাবী বিন আনাস (রা:) বলেন যে, ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে, অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা। ইমাম ইবনে জারীর (র:) বলেন যে, এসব মতের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। এগুলোর একই অর্থ। এর ভাবার্থ এই যে, তারা মুখের দ্বারা, অন্তর দ্বারা ও আমল দ্বারা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভয় রাখে। কুরআন মাজীদের মধ্যেও এ অর্থের ব্যবহার এসেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ঈমানদারগণকে সত্য বলে স্বীকার করে।" -[সূরা আত তাওবাহ: ৬১]

অন্য জায়গায় এসেছে,
"নিশ্চয় যারা তাদের প্রভুকে না দেখেই ভয় করে।" -[সূরা আল মূলক: ১২]

গায়বী, অদৃশ্য তথা অদেখা বিষয়সমূহ হল, এমনসব জিনিস যার উপলব্ধি জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্ভব নয়। যেমন মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর অহী (প্রত্যাদেশ), জান্নাত ও জাহান্নাম, ফিরিশতা, কবরের আযাব এবং মৃত দেহের পুনরুথান ইত্যাদি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:) কর্তৃক বর্ণিত এমন কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের অংশ যা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না। আর তা অস্বীকার করা কুফরী ও ভ্রষ্টতা। -[আহসানুল বায়ান]

".....সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।" -[সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৩]

এই আয়াতের প্রথমাংশের তাফসীরে- ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: 'তারা ফরয সালাত আদায় করে, সালেতে রূকু, সিজদাহ, তিলাওয়াত, নম্রতা এবং মনযোগ প্রতিষ্ঠিত করে। কাতাদাহ (র:) বলেন যে, সালাত প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হচ্ছে সালাতের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, ভালোভাবে অযু করা এবং রূকু ও সিজদাহ্ যথাযথভাবে আদায় করা ।

শেষাংশের তাফসীরে - ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, 'ব্যায় করা' এর অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায় করা।

হযরত ইবনে মাস'ঊদ (রা:) ও আরো কয়েকজন সাহাবী (রা:) বলেন যে, 'এর অর্থ হচ্ছে মানুষের তার সন্তান-সন্তনিদের পানাহার করানো। এটা যাকাতের হুকুমের পূর্বেকার আয়াত।'

কাতাদাহ (র:) বলেন, 'এই মাল তোমাদের নিকট আল্লাহর আমানত। অতি সত্বরই এটা তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। সুতরাং ইহলৌকিক জীবনে তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করো।'

ইমাম ইবনে জারীর (র:) বলেন, যে এই আয়াতটি সাধারণ। যাকাত, সন্তান-সন্তনির জন্য খরচ এবং যেসব লোককে দেয়া প্রয়োজন সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।

আমি (ইবনে কাছীর) বলি যে, কুরআনুল কারীমের মধ্যে অধিকাংশ জায়গায় সালাত ও মাল খরচ করার বর্ণনা মিলিতভাবে এসেছে। এজন্যে সালাত হচ্ছে আল্লাহর হক এবং তাঁর ইবাদাত, যা তাঁর একত্ববাদ, প্রশংসা, শ্রেষ্ঠত্ব, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর উপর ভরসা ও তাঁর নিকট প্রার্থনা করার নাম। আর 'ব্যায়' হচ্ছে সৃষ্ট জীবের প্রতি অনুগ্রহ করা, যার দ্বারা তাদের উপকার হয়। এর সবচেয়ে বেশি হকদার হচ্ছে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং দাস-দাসী, অতঃপর দূরের লোক ও অপরিচিত ব্যক্তিরা।


والَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
"এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।" -[সূরা বাকারাহ, আয়াত- ৪]

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- 'তুমি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে যা কিছু এনেছো এবং তোমার পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) যা কিছু এনেছিলো, তারা ঐ সমুদয়ের সত্যতা স্বীকার করবে। এ নয় যে কোনটা মানে ও কোনটা মানে না। বরং প্রভুর সমস্ত কথাই বিশ্বাস করে এবং পরকালের উপরও দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।' -[তাফসীর ইবনে কাছীর]

এই আয়াতে, পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস করার অর্থ হলো এই যে, যে গ্রন্থসমূহ পূর্ববর্তী নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিলো তা সবই সত্য। যদিও সেই কিতাবগুলো বর্তমানে আসল (অপরিবর্তীত) অবস্থায় পাওয়া যায় না। তাই সেগুলোর উপর আমলও করা যাবে না। এখন শুধু কুরআন ও তার ব্যাখ্যা হাদীসের উপর আমল করতে হবে। -[আহসানুল বায়ান]


তথ্যসূত্র

  • তাফসীর ইবনে কাছীর
  • তাফসীরে আহসানুল বায়ান


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

"পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। আপনার পালনকর্তা অতি দয়ালু। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।"